আশিকুর রহমান:
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ হয়ে যাওয়া দুই পর্বের বিশ্ব ইজতেমা পরবর্তী টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমার মাঠ প্রথম পর্বের পক্ষকে অন্যায়ভাবে বুঝিয়ে দেয়া ও তাবলীগ জামাতের মূলধারার বিপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে পক্ষপাতমূলক বৈষম্য আচরণ নিয়ে তাবলীগ জামাতের সাথীদের পক্ষ থেকে ২রা ফেব্রুয়ারী রোজ বৃহস্পতিবার, সকাল ১১ টায় সেক্টর -১০ উত্তরা মডেল টাউনে অবস্থিত (সি শেল) রেস্টুরেন্টে জরুরী সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে তাবলীগের দিল্লির নিজামুদ্দিন মার্কাজ অনুসারী সাধারণ সাথীদের পক্ষে এডভোকেট আব্দুল কুদ্দুস বাদল তাদের লিখিত বক্তব্য পেশ করেন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে কিছু জরুরীবিষয়ে আপনাদেরকে অবহিত করার জন্য আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলন।
আপনাদের জানা আছে, সম্প্রতি সময়ে শেষ হলো বাংলাদেশের টঙ্গীর মাঠে বিশ্ব ইজতেমা। যেখানে তাবলীগের মূলধারার সাথীদের ছাড়াও প্রায় ৯ হাজারের অধিক বিদেশি মেহমান দ্বিতীয় পর্বে উপস্থিত হয়েছিলেন পৃথিবীর ৬৪টি দেশ থেকে এবং দ্বিতীেয় পর্বের বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে দেশ-বিদেশে ৪ হাজারের অধিক জামাত
দাওয়াতের কাজে বের হয়েছেন, আলহামদুল্লিাহ। যা সত্যিকারের বিশ্ব ইজতেমায় রূপ লাভ করেছিল |
দেশবাসী ও মুসলিম উম্মাহর সুখ শান্তি নিরাপত্তা কামনা করে আখেরী মোনাজাতের মধ্য দিয়ে বিশ্ব ইজতেমা সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আমরা আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। পাশাপাশি এই ইজতেমার
শান্তি, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা পৌছে দিতে সাংবাদিক ভাইয়েরা যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন এবং অনেক কষ্ট করেছেন। বিশ্ব ইজতেমা ও
তাবলীগ জামাতের প্রতি হৃদয় থেকে আপনাদের এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতাকে আল্লাহ কবুল করুন। সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ তাআ’লা
উত্তম প্রতিদান করুন।
লিখিত বক্তব্যে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য বলেন, আপনারা হলেন জাতির বিবেক, আপনারা জানেন সরকার উভয় পক্ষকে নিয়ে বিশ্ব ইজতেমার তারিখ ঘোষনা করার
পরপরই মাওলানা জুবায়ের সাহেবের পক্ষে অবস্থান করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ৭দফা ঘোষনা করে তাবলীগের আভ্যান্তরিন বিষয়ে অবৈধ হস্তক্ষেপ করে। দুই পক্ষের আলাদা আলাদা ইজতেমা সেহেতু যার যার ইজতেমায় তার মেহমান আসবেন এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।
সেখানে হেফাজত ইসলাম দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমায় তাবলীগ জামাতের বিশ্ব আমীর হযরতজী মাওলানা সাদ কান্ধলভীর না আসার বিষয়ে দাবী পেশ করে এমনকি হেফাজতের নেতৃবৃন্দ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথেও এবিষয়ে সাক্ষাৎ করে আপত্তি জানায়। যদিও তিনি বিগত ২২ বছর ধরে টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করে আসছেন। ২০১৫ সালে পাকিস্তান থেকে আমীর বিহীন কথিত আলমি শূরা গঠনের আগে কেউ তার কোন ভুল ধরেন নি। সারা দুনিয়ার তাবলীগের সাথী ও বাংলাদেশের সাধারণ তাবলীগের সাথীরা তার নেতৃত্বই দাওয়াতের কাজ পূর্বের মতো করে যাচ্ছেন। মুলত এসব কাটপিস অপপ্রচার বাংলাদেশের হেফাজত সমর্থক সংশ্লিষ্টদের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি ছাড়া কিছুই নয়।
তাবলীগের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বারবার অশান্ত করতে এই বিষয়গুলো নিয়ে তৃতীয়পক্ষের উস্কানি, অপপ্রচার ও প্রসাশনের মধ্যেও প্রভাবতৈরি করে পক্ষপাতমূলক আচরণ সত্যিই আমাদের সবার জন্য দুঃখজনক বিষয়।
যেখানে বাংলাদেশ সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব ইজতেমার আয়োজনের জন্য আমাদের সর্বাত্বক সহযোগিতা করেছেন। তারপরেওআমাদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা ও বাঁধা দেয়া এবং বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে । আমরা মনে করি, যা বাংলাদেশের নাগরিকহিসাবে সরাসরি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারে হস্তক্ষেপ, যা সরাসরি সাংবিধানে হস্তক্ষেপের শামিল। ইজতেমা শুরুর আগে থেকেইসারাদেশে হেফাজত সমর্থক মাওলানা জুবায়ের সাহেবের গ্রুপ এর সাথে দ্বিতীয় পর্বের ইজতেমা নিয়ে অপপ্রচার ও নানান বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে
। ফলে এসব অপপ্রচার, উস্কানিমূলক কাজকর্ম বন্ধ ও শান্তিপূর্ণ সহবস্থান বজায় রাখতে ইসলামিক ফাউণ্ডেশনের পক্ষ থেকে মসজিদেমসজিদে সরকারি প্রজ্ঞাপন পাঠানো হয়। আপনার জানেন বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে তাবলীগ জামাতের বিভক্তির শুরু থেকে হেফাজত নেতারা সরাসরি হস্তক্ষেপ ও মাদরাসার ছাত্রদের ব্যাবহার করে তাবলীগের মূলধারার সাথীদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, হামলা থেকে শুরু করে এমন কোন ন্যাক্কারজনক কাজ নেই যা করা হচ্ছে না। টঙ্গির মাঠে ২০১৮ সালের পহেলা ডিসেম্বর মাদরসার ছাত্রদের ব্যাবহার করে দুইজন তাবলীগের সাথীকে শহীদ করা হয়। কিশোরগঞ্জে আব্দুর রহিমকে পেট্রোল ঢেলে গায়ে আগুন দিয়ে হত্যা করা হয়, বিবাড়িয়ায় একজনকে শহীদ করা হয়। কাকরাইল মসজিদে বিদেশী সাথীদের হেনস্থা করতে পরিকল্পিত জ্যামার বসানো হয়। জয়পুরহাটে ভারতীয় জামাতের আমীরকে এসিড মিশ্রিত পানি খাওয়ানো হয়েছে। সারাদেশে এরকম হাজারো নির্যাতনের কাহিনী উল্লেখ করা যাবে। এত কিছুর পরেও সারাদেশের তাবলীগের সাথীরা সবরের সাথে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে দাওয়াতের কাজকে চালিয়ে যাচ্ছেন। যার নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত হিসাবে শত বাঁধা, মসজিদে মসজিদে হুমকি ধমকি আর অপপ্রচার এর পাহাড় ডিঙিয়ে লক্ষ লক্ষ তাবলীগের সাথী সারাদেশ থেকে বিগতইজতেমায় হাজির হয়েছেন। এত কিছুর পরেও বিশ্ব ইজতেমার ময়দান নিয়ে তাবলীগ জামাত বাংলাদেশ ( মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারী) এর সাথে বরাবর মতো বৈরী ও বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করা হচ্ছে। বিগত ১ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং তারিখে তাবলীগের বিশ্ব মারকাজ দিল্লির
নিজামুদ্দিনের অনুসারী মূলধারার তাবলীগের সাথীদের দ্বারা টঙ্গী মাঠকে সরল বিশ্বাসে প্রসাশনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। কিন্তু হেফাজত মাদ্রাসা এলাকা, টিনশেড মসজিদ এবংসমর্থিত যুবায়ের সাহেবের গ্রুপকে রহস্যজনক ভাবে একতরফাভাবে এখন পর্যন্ত টঙ্গী ময়দানগোডাউন এলাকা ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে! যেখানে মূলধারার তাবলীগ ভাইদের কেবল প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমার জন্য ব্যবহারের করতে কেবলমাত্র ৫ দিনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষ একই প্যান্ডেলের নিচে ইজতেমা করলেও মাওলানা জুবায়ের গ্রুপকে সমস্ত ইজতেমার প্যান্ডেল নির্মাণ ও ভাঙ্গার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মূলধারার তাবলীগের ভাইদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও মাঠের কোন কাজ আমাদের করতে দেয়া হচ্ছে না।
সর্বশেষ পুরানো সাথীদের জোড়, হোম মিনিস্ট্রি স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মাওলানা জুবায়ের সাহেবের গ্রুপ বা তাবলীগের মূলধারার তাবলীগ
ভাইদেরকে জোড়ের জন্য ময়দান ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হবে না। তারপরও তারা টঙ্গী ময়দানে জোড় করেছেন। তাদের এই অনুমতি
কে দিয়েছেন?
এছাড়া বিশ্ব ইজতেমার মাঠে বিদ্যমান টিনশেডের পাশে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন তারা। কার অনুমতিক্রমে ? এ বিষয়েও তাবলীগের মূলধারার সাথে পরামর্শ করা হয়নি। টঙ্গী ময়দানে তাদের একছত্র অধিকার কে দিয়েছেন? এই বিশ্ব ইজতেমার মাঠ দিল্লির নিজামুদ্দিন বিশ্ব মার্কাজের অধীনে পরিচালিত তাবলীগ জামাতের ব্যবহারের জন্যই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ।
গত ৪ বছর যাবৎ মাওলানা জুবায়ের গ্রুপকে ৪ সপ্তাহের জন্য কাকরাইল ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আর মূলধারার তাবলীগেরসাথীদের মাত্র ২ সপ্তাহের জন্য ব্যাবহার করার অনুমতি রয়েছে। এই বিভাজনের কোন আইনগত এমনকি নৈতিক ভিত্তিও নেই। আমাদেরসাথে পরামর্শ না করে এবং হেফাজত সমর্থক এই বিচ্ছিন্ন তাবলীগের গ্রুপের মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসন এই একতরফা বিভাজন করেআসছেন।তাবলীগের বিশ্ব মারকাজ নিজামুদ্দিন এর অধিনে শত বছর ধরে পরিচালিত তাবলীগ জামাত। নিজামুদ্দিন মারকাজের অনুমোদিত বাংলাদেশের একমাত্র বৈধ প্রতিষ্ঠান কাকরাইল মারকাজ ও বিশ্ব ইজতেমা মাঠ। হেফাজতে ইসলামের মদদপুষ্টমাওলানা জুবায়ের গ্রুপ মূলত বিদ্রোহ করে তাবলীগের মূলধারা থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। তাই তাদের কাকরাইল মসজিদ/মারকাজ এবংটঙ্গির বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের বিষয়ে তাদের কোনো বৈধ দাবি নেই, এবং কোন দাবী থাকা উচিত ও নয়।
আজকের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে আপনাদের মাধ্যমে আবারও আমরা এই অসঙ্গতি সংশোধনের জোড় দাবি জানাচ্ছি। এবিষয় গুলোর ইনসাফ ভিত্তিক নিরপেক্ষ ভুমিকা পালন করে সুষ্ঠু সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আজকের সাংবাদিক সম্মেলন থেকে আমরা দাবী জানাচ্ছি,
১. আমাদের অনুরোধ বিশ্ব ইজতেমার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলেই মাঠের প্যান্ডেল নির্মান ও খোলার কাজ করবেন। প্রয়োজনে প্রসাশনের
তদারকিতে উভয় পক্ষ বিশ্ব ইজতেমার ময়দান ব্যাবহার করবেন।
২.কাকরাইল ও বিশ্ব ইজতেমার মাঠ থেকে দুই মাদ্রাসাকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা, কারণ শুধুমাত্র তাবলীগের কাজের জন্য এই মাঠ ও
কাকরাইল মসজিদ।
৩.মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অনুরোধ তাবলীগের সার্বিক কার্যক্রম ও বিশ্ব ইজতেমা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় প্রসাশনের সহযোগিতার
জন্য নিরপেক্ষ প্রভাবমুক্ত একটি কমিটি গঠন করা ।
৪.কাকরাইল মসজিদ পূর্বের মতো দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের অধিনে পরিচালনার যাবতীয় ব্যাবস্থা করা।
৫. দেশের সকল মসজিদে তাবলীগের সমস্ত কার্যক্রমের জন্য অনুমতি দেওয়া। ধর্মীয় কাজে বাঁধা দিলে ও অপপ্রচার চালালে সংবিধান
মোতাবেক আইনানুগ ব্যাবস্থা গ্রহণ করা। সারা দেশে স্বাধীনভাবে ধর্মীয় দাওয়াতি কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দেয়া।
টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমায় সকল মুরুব্বীদের আসার বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করা।
৭. বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রতি অক্ষুন্ন রাখতে ও দেশের শান্তি শৃংখলা বজায় রাখতে, তাবলীগের যাবতীয় কাজ পরিচালনায় হেফাজতসহ
তৃতীয় পক্ষের রাজনৈতিক অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। যাতে করে ইসলামের নামে কোন পক্ষ সাধারণ ধর্মপ্রান মুসলমানকে তাবলীগের নামে
কেউ ভুল বুঝিয়ে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করতে না পারে।
লিখিত বক্তব্য পাঠ শেষে উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে তাবলীগের দিল্লির নিজামুদ্দিন মার্কাজ অনুসারী সাধারণ সাথীদের পক্ষে মাওলানা সৈয়দ আনোয়ার আব্দুল্লাহ, এডভোকেট আব্দুল কুদ্দুস বাদল, মোহাম্মদ সায়েম, মোহাম্মদ সোহেল ও এডভোকেট ইউনুস মিয়া সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং সাংবাদিক সম্মেলন থেকে তাদের দেওয়া সাত দফা দাবী যথাসময়ে কার্যকর করার দাবী জানান।
